Connect with us

সিনেমা রিভিউ

‘পরাণ’ সিনেমার জয়জয়কার, যে ৫ কারণে হিট

সিনেমাওয়ালা রিপোর্টার

Published

on

শরিফুল রাজ, বিদ্যা সিনহা মিম

(বাঁ থেকে) শরিফুল রাজ, বিদ্যা সিনহা মিম, ইয়াশ রোহান ও রায়হান রাফি (ছবি: ফেসবুক)

টিকিট নাই! হাউজফুল! রায়হান রাফি পরিচালিত ‘পরাণ’ সিনেমার ক্ষেত্রে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে এসব শব্দ। বহুদিন পর কোনো বাংলা সিনেমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। ‘পরাণ’ নিয়ে চারদিক এতটা সরগরম যে, বড় পর্দায় প্রাণ ফিরেছে বলাই যায়। দুই-তিন দিন পরের টিকিট পেতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন ধরতে হচ্ছে অনেককে। সিনেমা হলভর্তি দর্শকের উপচেপড়া ভিড় তথা হাউজফুল শো দেখে সংশ্লিষ্টরা ভীষণ আনন্দিত। সিনেমাটি একই পরিবারের ৬০ জন দেখার মতো ঘটনাও আছে। সিনেমাটির মাধ্যমে বহুদিন পর আনন্দধারা বইছে!

ঈদুল আজহায় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পরাণ’ শুরুতে চারটি শোতে দেখিয়েছে স্টার সিনেপ্লেক্স। এখন স্টার সিনেপ্লেক্সের পান্থপথে বসুন্ধরা সিটি, জিগাতলার সীমান্ত সম্ভার, মিরপুরের সনি স্কয়ার, মহাখালীর এসকেএস টাওয়ার ও বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরসহ সব শাখা মিলিয়ে প্রতিদিন এর শো দাঁড়িয়েছে ২১টি। দেশীয় সিনেমার বেলায় এমন ঘটনা বিরল। ঈদের দিন থেকে ১১টি সিনেমা হলে মুক্তি পেলেও এখন ঢাকাসহ সারাদেশে ১৫টি সিনেমা হলে চলছে লাইভ টেকনোলজিস প্রযোজিত ‘পরাণ’।

শরিফুল রাজ ও বিদ্যা সিনহা মিম

‘পরাণ’ সিনেমায় শরিফুল রাজ ও বিদ্যা সিনহা মিম (ছবি: লাইভ টেকনোলজিস)

স্টার সিনেপ্লেক্সের মিডিয়া ব্যবস্থাপক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সিনেমাওয়ালা নিউজকে বলেন, ‘করোনা পরবর্তী সময়ে এবারই প্রথম কোনো বাংলা ছবি দেখতে বিপুলসংখ্যক দর্শক সমাগম হয়েছে। এর আগে ‘আয়নাবাজি’র ক্ষেত্রে এমন হয়েছিল। এটা আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য ইতিবাচক ব্যাপার। এরকম সিনেমা আরো হওয়া দরকার।’

‘পরাণ’ নিয়ে তারকা থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শকদের প্রশংসায় ভরে গেছে সোশ্যাল মিডিয়া। তাদের মতে, বহুদিন পর কোনো সিনেমা দেখে পরাণ জুড়ালো। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে মনে প্রশান্তি নিয়ে সিনেমা হল থেকে বের হচ্ছেন দর্শকরা। সবার মুখে মুখে চমৎকার কথা শুনে ‘পরাণ’ দেখতে সিনেমা হলে ভিড় করছেন অনেকে। মানুষের মুখে মুখে কোনো সিনেমা চলে গেলে বিপণন আপনাআপনি হয়ে যায়। পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে দর্শকরা সিনেমাটি দেখতে ভিড় করছেন। সবার মন্তব্য পর্যালোচনা করে সিনেমাটির ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়ার ৫টি শক্তিশালী দিক তুলে ধরা হলো।

রায়হান রাফি

‘পরাণ’ সিনেমার প্রধান তিন অভিনয়শিল্পীর মাঝে রায়হান রাফি (ছবি: ফেসবুক)

১. গল্প ও রায়হান রাফির মুন্সিয়ানা
বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের কতটা আগ্রহ তা বলাবাহুল্য। রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি এবং রিফাতকে খুন করা নয়ন বন্ড সবার পরিচিত। সেই সত্যি ঘটনার ছায়ায় সাজানো হয়েছে ‘পরাণ’। সত্যিই কি এটি মিন্নি-রিফাতের ঘটনা নিয়ে কিনা তা দেখতে ঢল নেমেছে। দর্শকের কাছে গল্প ভালো লাগলে সিনেমা ব্যবসাসফল হয়। ‘পরাণ’-এর গল্প, স্টোরিটেলিং ও নির্মাণ সবই ভালো।

ত্রিভুজ প্রেমের গল্প অসাধারণভাবে উপস্থাপনা করেছেন রায়হান রাফি। কম বাজেটে খুব যত্ন নিয়ে ভালো একটি সিনেমা বানিয়েছেন তিনি। দর্শককে চুম্বকের মতো পর্দায় আটকে রাখার ক্ষেত্রে সফল এই নির্মাতা। গল্পকেই মূল নায়ক হিসেবে দেখছেন দর্শকরা। একটা সাধারণ গল্প শুধু বলার ধরনেই অন্যরকম হয়ে যেতে পারে, এর চমৎকার উদাহরণ ‘পরাণ’। একটি রুদ্ধশ্বাস গল্পের মাঝে সুন্দরভাবে পরিমাণ মতো কমিক রিলিফ দিয়েছেন পরিচালক। সংলাপ রচনা ও ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট চমৎকার। গল্পের ভাঁজে ভাঁজে টুইস্ট আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। মধ্যবিত্তের গল্প, শিক্ষকদের অপমান করা এবং যুব রাজনীতির ফাঁকফোকর তুলে ধরা হয়েছে এতে। চিত্রগ্রাহক মিছিল সাহার কাজ এবং সিমিত র‍য় অন্তরের পোস্ট প্রোডাকশন ও কালার অসাধারণ লেগেছে দর্শকদের।

শরিফুল রাজ

শরিফুল রাজ (ছবি: ফেসবুক)

২. অনবদ্য শরিফুল রাজ
‘পরাণ’ সিনেমার শক্তিশালী দিক হলো অভিনয়শিল্পীদের নৈপুণ্য। তাদের মধ্যে রোমান চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন শরিফুল রাজ। তার অভিব্যক্তি, বাচনভঙ্গি, অভিনয়ের স্টাইল অন্যমাত্রার। তাকে দেখে দর্শকরা অভিভূত। সিনেমা হলভর্তি দর্শক তার পারফরম্যান্সে করতালির সঙ্গে গলা ফাটিয়ে প্রশংসা করেছেন। তারা মনে করেন, তিনি এরকম অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে যেতে পারলে বাংলা সিনেমার লম্বা রেসের ঘোড়া হতে পারেন। সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই প্রশংসায় ভাসছেন এই তারকা। পুরো সিনেমা জুড়ে ‘রাজ’ করেছেন তিনি। এলাকার ত্রাস রোমানের ভূমিকায় বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দারুণ সাবলীল। বিশেষ করে জেলে দেখা করতে আসা অনন্যার পা জড়িয়ে ধরে রাজের কান্নার দৃশ্য অসাধারণ। রোমান একইসঙ্গে বখাটে এবং প্রেমিক পুরুষ। ভালোবাসার মানুষটাকে একান্তই নিজের করে পাওয়ার জন্য কতকিছুই না ত্যাগ করে এই তরুণ। প্রেমে প্রতারিত হওয়া মাস্তানের চরিত্রে সবার মন জয় করেছেন রাজ। তার সুবাদেই রোমান চরিত্রকে ঘৃণার বদলে ভালোবেসেছে দর্শকরা। তিনিই এখন দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে আলোচিত তারকা। তাকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে ব্যাপক হইচই ও উচ্ছ্বাস।

ইয়াশ রোহান, বিদ্যা সিনহা মিম ও শরিফুল রাজ

(বাঁ থেকে) ইয়াশ রোহান, বিদ্যা সিনহা মিম ও শরিফুল রাজ (ছবি: ফেসবুক)

৩. মিমের ক্যারিয়ার সেরা পারফরম্যান্স
অনন্যা চরিত্রে বিদ্যা সিনহা মিম রীতিমতো বাজিমাত করেছেন। এখন পর্যন্ত এটাই তার ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে দেখছেন সাধারণ দর্শকরা। সদ্য যৌবনে পা দিলে একটি মেয়ে যেমন আচরণ করে এবং বারবার ভুল সিদ্ধান্তে জড়ায়, মিম সেসব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার কিছু আহ্লাদীপনা সাধারণ মানুষ অনেক পছন্দ করেছে। অনন্যা চরিত্রে মিম দেখিয়েছেন, কতটা অসামান্য তিনি। রূপে নয়, এবার অভিনয়ে মন ভুলিয়েছেন মিম। ‘পরাণ’ হয়ে থাকবে তার ক্যারিয়ারের একটি টার্নিং পয়েন্ট।

বিদ্যা সিনহা মিম ও ইয়াশ রোহান

(বাঁ থেকে) বিদ্যা সিনহা মিম ও ইয়াশ রোহান (ছবি: ফেসবুক)

৪. অভিনয়শিল্পীদের সম্মিলিত পারফরম্যান্স
প্রত্যেক অভিনেতা-অভিনেত্রী নিজ নিজ চরিত্রে পুরোটা ঢেলে দিয়েছেন। সিফাত চরিত্রে ইয়াশ রোহানের দারুণ অভিনয় মন কেড়েছে দর্শকদের। সিনেমার প্রায় অর্ধেকটা চলে যাওয়ার পর তিনি পর্দায় এসেছেন। এছাড়া এসআই চরিত্রে নাসির উদ্দিন খানের কমিক টাইমিং অসাধারণ লেগেছে সবার। তিনি পর্দায় এলেই দর্শকদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। সিনেমার বাঁকবদল করা তোতলা তোজো চরিত্রে রাশেদ মামুন অপু স্বভাবসুলভ অভিনয় দেখিয়েছেন। তার ডায়লগ ডেলিভারি ভালো লেগেছে দর্শকদের। রোজী সিদ্দিকীকে নেতিবাচক চরিত্রে ভালো মানিয়েছে। শহীদুজ্জামান সেলিম, শিল্পী সরকার অপু, ডেইজি সরকার ও মিলি বাশারের অভিনয় সাবলীল। মাহাদী হাসান পিয়াল মাত্র একটি দৃশ্যেই মাতিয়ে দিয়েছেন।

অয়ন চাকলাদার, রায়হান রাফি ও আতিয়া আনিসা

(বাঁ থেকে) অয়ন চাকলাদার, রায়হান রাফি ও আতিয়া আনিসা (ছবি: ফেসবুক)

৫. শ্রুতিমধুর গান
সিনেমায় গান একটা আলাদা মাত্রা যোগ করে। ‘পরাণ’ সিনেমায় মৌলিক তিনটি ও লোকজ আঙ্গিকের একটি সংগৃহীত গান আছে। সবই বেশ চমৎকার। এরমধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘চলো নিরালায়’। এটি প্রকাশের পরপরই ছড়িয়ে পড়েছে সবার মুখে মুখে। অয়ন চাকলাদার ও আতিয়া আনিসার গাওয়া গানটি সাধারণ শ্রোতাদের পাশাপাশি কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর, আঁখি আলমগীর, নাট্যকার জিনাত হাকিম, অভিনয়শিল্পী ফারিয়া শাহরিনসহ তারকাদেরও মন জয় করেছে। তাদের মন্তব্য, বহুদিন পর কোনো সিনেমার গান এতটা ভালো লাগলো। গানটির ভিডিও দেখে অনেকের মধ্যে সিনেমাটি দেখার আগ্রহ জন্মেছে। ‘চলো নিরালায়’ লিখেছেন গীতিকবি জনি হক, সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন নাভেদ পারভেজ।

Advertisement

সিনেমাওয়ালা প্রচ্ছদ